মেদিগঞ্জ মসজিদের ইতিহাস, রহস্য ও অলৌকিকতার এক অমীমাংসিত গল্প
শাহিন খাঁন : – বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কালীগঞ্জ সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময় স্থাপনা তিন গম্বুজ ও চার মিনারে সাজানো ধবধবে সাদা একটি প্রাচীন মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি মেদিগঞ্জ মসজিদ নামে পরিচিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম শাহী জামে মসজিদ। ইতিহাস, লোককথা ও নানা অলৌকিক গল্পে ঘেরা এই মসজিদকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে চলছে নানা কৌতূহল ও আলোচনা।
কুন্ডু বাড়ি সংলগ্ন কালভার্টের উত্তর পাশে অবস্থিত মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দূর থেকেই নজর কাড়ে। তিনটি সুদৃশ্য গম্বুজ এবং চার কোণায় চারটি উঁচু মিনার নিয়ে নির্মিত এ স্থাপনাটি বহুদিন ধরে স্থানীয়দের কাছে এক রহস্যময় ঐতিহ্য হয়ে রয়েছে।
মসজিদটির প্রকৃত বয়স বা নির্মাণকাল নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো দালিলিক তথ্য নেই। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত নানা গল্প রয়েছে এ নিয়ে। কেউ বলেন, এটি বহু বছর আগে মাটির নিচে চাপা ছিল এবং একসময় নিজে থেকেই মাটির ওপর ভেসে ওঠে। আবার কেউ দাবি করেন, মোগল আমলে এটি নির্মিত হয়েছিল।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোগল সম্রাট শায়েস্তা খাঁ-এর শাসনামলে তাঁর এক সুবেদার শেখ সফিউল্লাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে সময়ের বিবর্তন, সংস্কার এবং পুনর্নির্মাণের ফলে এর প্রাচীন স্থাপত্যের অনেক বৈশিষ্ট্য আজ আর স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না
স্থানীয় প্রবীণদের মুখে আরেকটি কাহিনি শোনা যায়। ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর বরিশাল অঞ্চলে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ঝড়ের পর এলাকায় ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ করেই এই মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সে সময় এলাকাজুড়ে বাঘের আনাগোনা থাকলেও আশ্চর্যজনকভাবে মসজিদটির কোনো ক্ষতি হয়নি বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
মসজিদটিকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত গল্প হলো জিনের উপস্থিতি। স্থানীয় অনেকেই বিশ্বাস করেন, রাত গভীর হলে এখানে জিনেরা সমবেত হয়ে জামাতে নামাজ আদায় করে। কেউ কেউ দাবি করেন, মাঝরাতে মসজিদের ভেতর থেকে অস্পষ্ট কান্নার শব্দ বা ফিসফিস আওয়াজ ভেসে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন (৬০) বলেন, আমার বাবা তাঁর বাবার কাছ থেকে এই গল্প শুনেছেন। আমরাও ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। আমি নিজেও গভীর রাতে এই মসজিদের দিক থেকে অদ্ভুত কান্নার মতো শব্দ শুনেছি।
স্থানীয়দের মুখে আরও একটি ঘটনার কথা শোনা যায়, যা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। কয়েক বছর আগে ঢাকার একটি তাবলিগ জামাতের সদস্যরা রাতে এখানে অবস্থান করেছিলেন। পরদিন সকালে তাদের একজনকে মসজিদের ভেতরে পাওয়া যায়নি। পরে তাকে পাশের একটি নির্জন জায়গায় অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকে অনেকেই রাতে এখানে অবস্থান করতে সাহস পান না বলে জানান স্থানীয়রা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির মূল কাঠামোতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে প্রাচীন স্থাপত্যের ছাপ ছিল, এখন সেখানে আধুনিক টাইলস ও পিলারের ব্যবহার দেখা যায়। প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া পিলার দিয়ে মসজিদের ভেতরের অংশ মজবুত করা হয়েছে। মসজিদের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বড় ঈদগাহ মাঠ। পাশে রয়েছে টলটলে জলের একটি পুরনো পুকুর এবং তার পাশেই একটি কবরস্থান।
মসজিদটির বর্তমান ইমাম মাওলানা ফেরদাউস জানান, এক সময় সম্ভ্রান্ত হিন্দু জমিদার জগবন্ধু তালুকদার এই জমিটি দান করেছিলেন হানিফ খা মৃধা নামের এক ব্যক্তির নামে। পরে জমিটি ওয়াকফ করা হয়।
তার ভাষায়, প্রায় এক একর ৫৫ শতাংশ জমির ওপর এই মসজিদ ও আশপাশের এলাকা অবস্থিত। এর অর্ধেক জুড়ে রয়েছে মসজিদের স্থাপনা, বাকি অংশে রয়েছে পুকুর ও কবরস্থান। এর আগে তার পিতা দীর্ঘদিন এই মসজিদের ইমাম ছিলেন। তিনি নাকি প্রায়ই জিনদের উপস্থিতি অনুভব করতেন বলে পরিবারের কাছে উল্লেখ করেছিলেন।
লোককথা আর রহস্যের পাশাপাশি এই মসজিদকে ঘিরে সাধারণ মানুষের গভীর বিশ্বাসও রয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে এসে নামাজ আদায় করেন, দান করেন কিংবা মানত করেন।
পটুয়াখালীর দুমকি থেকে আসা মুসল্লি ইলিয়াস রহমান বলেন,এই মসজিদের অলৌকিকতার কথা শুনে এখানে এসেছি। এখানে নামাজ পড়লে মনে এক ধরনের প্রশান্তি পাওয়া যায়। আরেক দর্শনার্থী সজল আকবর জানান, মনের বাসনা পূরণের আশায় তিনি এখানে দান করতে এসেছেন।
স্থানীয়দের মতে, ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
বরিশাল বাকেরগঞ্জ প্রফুল্ল বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা পঙ্কজ দাস বলেন,এমন একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা যেকোনো মূল্যে সংরক্ষণ করা উচিত। এর ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে জানানো দরকার।
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর বরিশালের সহকারী কাস্টডিয়ান আরিফুর রহমান বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ না হওয়ায় শুধু এই মসজিদ নয়, বরিশাল বিভাগের অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। তবে খুব শিগগিরই বিভাগজুড়ে এমন জরিপ কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতিহাস, লোককথা, রহস্য আর মানুষের অগাধ বিশ্বাস সব মিলিয়ে মেদিগঞ্জ মসজিদ আজও বরিশালের এক অনন্য দর্শনীয় স্থান হয়ে আছে। দিনের বেলায় এটি শান্ত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত ধর্মীয় স্থাপনা হলেও রাত নামলেই যেন নতুন করে জন্ম নেয় এক রহস্যময় গল্প।
Array