সারা দেশে নিষিদ্ধ পলিথিনের ছড়াছড়ি দৈনিক ৫০থেকে ৬০কোটি টাকার ব্যবসা
ফেরদৌসী আক্তার চৌধুরী :- রাজধানীর চকবাজার এলাকায় অন্তত ৬ শতাধিক কারখানায় উৎপাদিত নিষিদ্ধ পলিথিন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এখান থেকে বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার পলিথিন ব্যবসা হচ্ছে। এসব পলিথিন নদ-নদী, পরিবেশ ও কৃষিজমির জন্য ক্যানসারের মতো ক্ষত সৃষ্টি করছে। এসব পলিথিন একাধিক চক্রের মাধ্যমে সারা দেশে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন বাজার থেকে উচ্ছেদে কার্যকরভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, ৪০ বছর ধরে পলিথিন ব্যবসা গড়ে উঠলেও ২০০২ সালে ২০ মাইক্রোন পুরুত্বের নিচে পলিথিন উৎপাদন, বিপণন, ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করে আইন করে সরকার। ওই সময় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ১/১১ পটপরিবর্তনের পর সাবেক সংসদ-সদস্য হাজি সেলিম, তার ছেলেরা ও ভাগিনা হাসান পিল্লুর ছত্রছায়ায় ফুলেফেঁপে ওঠে অবৈধ পলিথিন ব্যবসা। বর্তমানে অবৈধ পলিথিন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন মোতালেব, জুয়েল, বকুল, আনিছসহ অন্তত ৬ শতাধিক কারখানা মালিক। এছাড়া আমিনুল হক মুরাদ নামে আরেকজন হয়ে উঠেছেন বিপণনের প্রধান এজেন্ট। তার মালিকানাধীন রহমানিয়া ও মধুপুর নামে দুটি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মাধ্যমে সারা দেশে পলিথিন পৌঁছে দেওয়ার নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কিছু লোকের ছত্রছায়ায় ‘সর্বস্তরে ম্যানেজ’ করে নিরাপদে পলিথিন বিপণনের জন্য দৈনিক ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা হাজিরায় ৫ শতাধিক পাহারাদারের বিশাল বহর নিয়োগ করা হয়েছে। তারা চকবাজারের ইমামগঞ্জ ও সোয়ারীঘাট এলাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদিত কয়েকশ টন পলিথিন কঠোর নিরাপত্তা প্রহরায় অন্তত ৩০টি কনটেইনারে লোড করে কাঁচপুর, টঙ্গী, বেড়িবাঁধ দিয়ে আমীনবাজার ও পোস্তগোলা পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছে দিচ্ছে।
সূত্র বলছে, ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার পলিথিন বেচাকেনা হচ্ছে। ওই হিসাবে বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ পলিথিনের বাজার গড়ে উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সিটি করপোরেশনের অনুমতিবিহীন নিষিদ্ধ পলিথিন দেদার উৎপাদন হলেও এর লাভের অধিকাংশ বিপণনকারীরা নিয়ে যাচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্স না থাকার সুযোগে পলি ব্যবসায়ীরা কর ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া চকবাজার এলাকায় মুরাদ ও তার সহযোগীদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই তার লোকজনের হাতে মামলা-হামলাসহ হেনস্তার শিকার হয়েছেন অসংখ্য ভুক্তভোগী। একাধিকবার পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযানরত মোবাইল কোর্ট, পুলিশ, সাংবাদিকের ওপরও তারা হামলা করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বকশিবাজার বোর্ড অফিসের পেছনে নয়া গলি মাদ্রাসার আশপাশে বকুলের পলি প্রিন্টিং কারখানা রয়েছে। এগুলোর তত্ত্বাবধানে আছে ফয়সাল ও সোহেল। এগুলোর মধ্যে বকুল একাই অন্তত ৪০টি কারখানায় উৎপাদিত পলিথিন বকুল ব্যান্ডে প্রিন্টিং করে বাজারজাত করছেন।
সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা বলেন, বড় কারখানায় প্রতিদিন ২০-২৫টি ও ছোট কারখানায় ৫-১০টি অটোমেশিনে প্রতিটি কারখানা প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ টন পলিথিন উৎপাদন করে। প্রতি পাউন্ড পলিথিন পাইকারি দরে ১৫০ টাকা করে চকবাজার থেকে বিক্রি করা হয়। এতে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার পলিথিন নগদ লেনদেন হওয়ায় সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। আইন অমান্য করে দেদারছে এই ব্যবসা করে মালিকরা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও শ্রমিকরা শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
কারিগর খোকন, সাঈদ, আনোয়ার, দেলোয়ার মিস্ত্রি ও সিরাজ মুন্সিসহ কয়েকজন বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই পলিথিন ব্যবসা চলছে। ৭০-৮০ হাজার শ্রমিক এতে জড়িত। শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামান্য পারিশ্রমিকে এসব কাজ করছে। সরকার বিকল্প শিল্প দিলে এই কাজ ছাড়তে চান বলে জানান তারা। নিয়মিত পলিথিন বহনকারী একাধিক ভ্যানচালক বলেন, পুরান ঢাকায় ৬০০-৭০০ পলিথিন কারখানা রয়েছে। প্রতিদিন ৪০-৫০ কোটি টাকার পলিথিন বিক্রি হয়। প্রশাসন ধরলে ‘হাজি মুরাদের নাম’ বললে ছেড়ে দেয়। পলিথিন পরিবহণের কথা স্বীকার করে হাজি আমিনুল হক মুরাদ বলেন, যেভাবে সারা দেশে সিন্ডিকেটের কথা বলা হচ্ছে, এগুলো আমার নাম বেচা হচ্ছে। আমি এতগুলোর সঙ্গে যুক্ত নই। তিনি বলেন, মাসে ৩০ কনটেইনার পলিথিনও যায় না বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, পলিথিনের বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার বিস্তারিত কোনো ধারণা নেই। প্রতিদিন অন্তত ৬০ কোটি টাকার পলিথিন বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, আমার মনে হয় না, এত বড় অঙ্কের লেনদেন হয়। বাস্তবে পরিমাণটি এত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। স্কট প্রহরার অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, আমি এখানে মাত্র দুই-আড়াই মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এত বড় কোন বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। তাছাড়া পলিথিন সিন্ডিকেট বা এ ধরনের কার্যক্রম সম্পর্কে আমার কাছে নির্দিষ্ট কোন তথ্য বা ধারণা নেই। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) সৈয়দ ফরহাদ হোসেন দৈনিক প্রতিদিন খবর কে বলেন, পলিথিন বন্ধে আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে গত ৬ মাসের পরিসংখ্যান রয়েছে।
