জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তার নতুন দিগন্ত তুলে ধরলেন ড. আসিফ মিজান
বিশেষ প্রতিনিধি :-বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশজুড়ে এখন নতুন ভোরের আলো। এই আলো যেমন রাজনৈতিক মুক্তির, তেমনি তা অবরুদ্ধ সংস্কৃতি ও ভূলুণ্ঠিত জাতিসত্তাকে ফিরে পাওয়ারও। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশি কালচারাল সোসাইটি’ আয়োজিত এক মহতী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এই অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও সময়োপযোগী আহ্বানটিই অত্যন্ত আবেগঘন ও তাত্ত্বিকভাবে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক ও রাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আসিফ মিজান।
উল্লেখযোগ্য যে, অনুষ্ঠানটির অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিলেন সোমালিয়ার দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. আসিফ মিজান। প্রথম বাংলাদেশী প্রফেসর হিসেবে বিদেশের মাটিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদের গৌরব অর্জন করে তিনি বিশ্বদরবারে আমাদের লাল-সবুজের পতাকাকে সুউচ্চ ও মহিমান্বিত করেছেন। প্রবাসে থেকেও দেশের মাটির টান এবং এর বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তিই যে তাঁর মূল সাধনা, তা আবারও প্রমাণিত হলো তাঁর এই কালজয়ী বক্তব্যে।
মঞ্চের আলো ও গুণীজন সংবর্ধনঃ
বক্তব্যের শুরুতেই প্রফেসর ড. আসিফ মিজান মঞ্চে উপবিষ্ট বিশিষ্ট অতিথিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যা অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য আবেগ ও সৌহার্দ্যের আবহে জড়িয়ে নেয়। তিনি একই স্রোতে মঞ্চের নক্ষত্রদের এক এক করে গভীর সম্মানে ভূষিত করে বলেন—
“আজকের এই মঞ্চ এক অনন্য মর্যাদায় ভাস্বর। আমার পরম সৌভাগ্য যে, ঠিক আমার পাশেই উপবিষ্ট আছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সাবেক সিনিয়র মন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাপূর্ণ) মশিউর রহমান যাদু মিয়ার সুযোগ্যা উত্তরসূরি, পরম শ্রদ্ধেয় রিতা রহমান আপা। মঞ্চ অলঙ্কৃত করে আরও উপস্থিত আছেন দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী ও বর্তমান মাননীয় এমপি বেগম সেলিনা রহমান, বিশিষ্ট নারী নেতৃত্ব ও মাননীয় এমপি ফরিদা ইয়াসমিন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ মাসুম এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাবিব করিম।”
পাশাপাশি, পুরো অনুষ্ঠানের সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করে তিনি বলেন, পুরো আয়োজনের আবহকে পরম যত্নে ও ভালোবাসায় আগলে রেখেছেন অনুষ্ঠানের সম্মানিত সভাপতি, বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও সফল ব্যবসায়ী ড. মোঃ আলমগীর হোসেন। একই সাথে অনুষ্ঠানে সমবেত দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, প্রথিতযশা সাংবাদিক, কলাকুশলী এবং বিভিন্ন অঙ্গনের গুণীজনদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে সার্থক করেছে উল্লেখ করে ড. মিজান তাঁদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।
সংস্কৃতির বিকৃতি ও fascist আগ্রাসনঃ
সময়োপযোগী এই আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে ড. আসিফ মিজানের বক্তব্যে উঠে আসে বিগত ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশের রূঢ় বাস্তবতার চিত্র। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও বেদনার সাথে স্মরণ করিয়ে দেন যে—
“বিগত fascist হাসিনা সরকার ওপারের (পার্শ্ববর্তী দেশের) ইশারায় ও পরামর্শে আমাদের রাষ্ট্রের সকল স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকেই শুধু ধ্বংস করেনি, বরং আমাদের হাজার বছরের অনন্য জাতিসত্তাকে চিরতরে মুছে দেওয়ার এক সুগভীর চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। ‘দাদাদের’ প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী আমাদের স্বকীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যার ফলে, অর্থনীতির মতো আমাদের প্রাণের শিল্প-সংস্কৃতিও আজ সম্পূর্ণ মুখথুবড়ে পরেছে।”
ড. মিজান বলেন, এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ছিল মূলত তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি পরনির্ভরশীল ও আজ্ঞাবহ জাতিতে পরিণত করার সুকৌশলী নীল নকশা।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও আগামীর রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতাঃ
বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তর প্রসঙ্গে ড. আসিফ মিজান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন উপস্থাপন করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার একটি সাম্য ও ইনক্লুসিভ সোসাইটি (অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ) প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। তিনি এক গভীর রাজনৈতিক সত্য উচ্চারণ করে বলেন—
“আমরা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ vote দিয়ে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানকে ক্ষমতায় আনলেও, এই সরকার হবে সমগ্র বাংলাদেশের সরকার, কেবল কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা দলের সরকার নয়। দেশের প্রতিটি নাগরিক, এমনকি প্রতিটি জীব এবং প্রাণীও এই রাষ্ট্রের ছায়াতলে নিরাপদ থাকবে— এটাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের মূল স্পিরিট এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি’র দৃঢ় অঙ্গীকার।”
এ পর্যায়ে তিনি দেশনায়ক তারেক রহমানের সেই ঐতিহাসিক ‘রাজকীয় প্রত্যাবর্তন’-এর দিনটিকে স্মরণ করে লক্ষ-কোটি জনতার সামনে দেওয়া তাঁর সেই জাদুকরী উক্তিটি পুনর্ব্যক্ত করেন: “I’ve a plan!”
ড. মিজান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, তারেক রহমানের সেই পরিকল্পনা যে কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তন নয়, বরং গোটা দেশকে আমূল বদলে দেওয়ার এক মহৎ মহাপরিকল্পনা— তা আমরা ইতোমধ্যেই তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপে দেখতে পাচ্ছি। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে— “Morning shows the day” (সকালই বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে)। জনাব তারেক রহমান তাঁর চলনে-বলনে, মননশীলতায় এবং প্রজ্ঞাঘন দূরদর্শিতায় ইতোমধ্যেই আমাদের মনোজগতে ও চিন্তার জগতে এক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন, যা একটি টেকসই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।
জাতীয়তাবাদের সঠিক আখ্যান: “আমরা বাংলাদেশি”
বক্তব্যের সবচেয়ে তাত্ত্বিক ও আবেগঘন অংশটি ছিল আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট মোচন নিয়ে। ড. আসিফ মিজান অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, fascist সরকার সুকৌশলে বৈচিত্র্যময় এই ভূখণ্ডের সকল ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ওপর একক ‘বাঙালি’ পরিচয় চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। এই জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া পরিচয়ের বেড়াজাল ছিন্ন করে আমাদের আবারও ফিরে যেতে হবে আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রদর্শিত সত্যের আলোয়।
শহীদ জিয়া গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, নানা ধর্ম, বর্ণ এবং বহু ভাষাভাষী মানুষের এই বাংলাদেশে সকলের একটিই অনন্য, বৈষম্যহীন এবং পরম সম্মানের ইউনিক পরিচয় হওয়া উচিত— আর তা হলো “আমরা বাংলাদেশি”। ড. মিজান উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, তরুণ প্রজন্মের মন থেকে সাংস্কৃতিক দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে এই সঠিক ও গৌরবান্বিত জাতিসত্তার পরিচয়টি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় ছড়িয়ে দিতে হবে।
সংস্কৃতির নতুন দিগন্তঃ
পরিশেষে, প্রফেসর ড. আসিফ মিজান ‘বাংলাদেশি কালচারাল সোসাইটি’র এই উদ্যোগকে এক অনন্য ও কালজয়ী আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করেন। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে মঞ্চের সামনে উপবিষ্ট বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ ও বুদ্ধিজীবীদেরই।
বিদেশে বাংলাদেশের পতাকাবাহী এই অনন্য মনীষী দেশের সকল সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে তাঁর বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন এক ঐতিহাসিক ও আবেগময় প্রত্যয়ে— “আপনাদের সকল শুভ ও দেশপ্রেমিক উদ্যোগে আমি সবসময় পাশে আছি; কারণ, দিনশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশি।”
দেশপ্রেম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের এই মেলবন্ধনই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।
