পটুয়াখালী ডিসি কার্যালয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় এলএ শাখায় ৬০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, দুই মামলা-দুই আপস, সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগও সামনে
নিজস্ব প্রতিবেদক :- পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখাকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। ১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ১৩৭ টাকা ক্ষতিপূরণের অর্থ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৬০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এলএ শাখার প্রধান সহকারী মো. খালিদ হোসাইনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় আদালতে পৃথক দুটি মামলা হলেও পরবর্তীতে উভয় মামলাই আপসের মাধ্যমে প্রত্যাহার হয়েছে বলে প্রকাশিত নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের আর্থিক দিক, চেক লেনদেন এবং ভূমি অধিগ্রহণের নথিপত্র যাচাই নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। ইতোমধ্যে বিভাগীয় পর্যায় থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন—তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং এর ফলাফল কী?
তিন চেকে ৬০ লাখ—নথিতে কী আছে?
মামলার বর্ণনা ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লালুয়া মৌজার জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ১৩৭ টাকা পাওয়ার কথা ছিল মো. মোশারেফ সরদারের। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের অর্থ পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁর কাছ থেকে স্বাক্ষর করা তিনটি চেক নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ওই চেকের মাধ্যমে মোট ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্তকারীদের সামনে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—
চেকের মূল কপি ও নম্বর;
ব্যাংক হিসাবের বিবরণী;
চেক উপস্থাপনের তথ্য;
টাকা উত্তোলনের তারিখ ও স্থান;
ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ;
সংশ্লিষ্ট এলএ কেসের নথি;
ক্ষতিপূরণের অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের কাগজপত্র;
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বের বিবরণ।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে এলএ কেস নং ৬, ১৮ ও ১৯-এর নথিও অনুসন্ধানের আওতায় আসার কথা বলা হয়েছে।
দুই মামলা, দুই দফা আপস
প্রথমে সিআর মামলা নং ১০১৪/২০২৬ এবং পরবর্তীতে সিআর মামলা নং ১০৯৯/২০২৬ দায়েরের তথ্য সামনে এসেছে। উভয় মামলাতেই দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারার উল্লেখ রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে দুই মামলাই আপসের মাধ্যমে প্রত্যাহার করা হয় বলে জানা গেছে।
তবে মামলা প্রত্যাহার হওয়া আর অভিযোগের আর্থিক সত্যতা যাচাই—দুটি পৃথক বিষয়। বিশেষ করে অভিযোগের সঙ্গে সরকারি ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ও একজন সরকারি কর্মচারীর দায়িত্বের প্রশ্ন জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি ও লেনদেনের স্বচ্ছ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্ত শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি:
আগের অভিযোগের পর ৭ সেপ্টেম্বর বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তদন্তের নির্দেশ এবং ১০ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় সহকারী কমিশনার মারযুক রহমান রিফাতের তদন্ত পরিচালনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহসিন উদ্দিনের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে খালিদ হোসাইন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ৩০ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করে যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তিনি তা মেনে নেবেন।
নতুন অভিযোগে আবারও এলএ শাখা আলোচনায়
১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে খালিদ হোসাইনের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের অর্থ উত্তোলনে অনিয়ম, স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া এবং ৩০ শতাংশ কমিশন দাবির নতুন অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেও প্রশাসনিক তদন্ত চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু একই শাখাকে ঘিরে ধারাবাহিকভাবে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এলএ শাখার সামগ্রিক কার্যক্রমের ওপর স্বাধীন ও নথিভিত্তিক পর্যালোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধার অভিযোগ:
এদিকে অভিযোগ অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রবেশ, তথ্য সংগ্রহ এবং ক্যামেরায় ধারণের সময় দুর্ব্যবহার, বাধা ও হয়রানির অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাজন বসাকের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে সাংবাদিকদের মারধর, মব তৈরি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ক্যামেরা বন্ধে চাপ প্রয়োগ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগগুলোর পক্ষে নির্দিষ্ট ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, লিখিত অভিযোগ বা অন্যান্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া না গেলে সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই যাচাই করা প্রয়োজন।
‘খুঁটির জোর’ কোথায়—উঠছে প্রশ্ন?
একদিকে এলএ শাখায় কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ নিয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ, অন্যদিকে একই শাখার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন করে কমিশন দাবির অভিযোগ—দুই ঘটনাকে আলাদাভাবে না দেখে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামোও পরীক্ষা করা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলএ শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে জমি হারানো মানুষের ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে কোনো অনিয়ম হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। তাই তদন্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি ফাইল ব্যবস্থাপনা, অর্থ ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়া, মধ্যস্থতাকারী বা দালালের ভূমিকা এবং দায়িত্ব বণ্টন যাচাই করা জরুরি।
দুদকের নজরদারির দাবি
অভিযোগের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন, চেক, সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ এবং ভূমি অধিগ্রহণের নথি জড়িত থাকায় অভিযোগকারী ও সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে অন্তত এসব বিষয় যাচাই করা যেতে পারে—
ব্যাংক স্টেটমেন্ট → চেকের মূল কপি → চেক উপস্থাপনকারী → টাকা গ্রহণকারী → সিসিটিভি ফুটেজ → এলএ কেস ফাইল → ক্ষতিপূরণের হিসাব → অনুমোদন ও অর্থ ছাড় → সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও সরকারি দপ্তর থেকে নথি সংগ্রহ করে আর্থিক লেনদেনের একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রেইল তৈরি করা সম্ভব।
মানববন্ধনের ঘোষণার কথাও সামনে এসেছে
সাংবাদিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বিষয়টির প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি—সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা না দিয়ে অভিযোগগুলো তদন্তের সুযোগ দিতে হবে এবং প্রশাসনের ভেতরে কোনো অনিয়ম থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
শেষ কথা—অভিযোগ নয়, চাই নথিভিত্তিক সত্য
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের এলএ শাখাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আর শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—কারণ এর সঙ্গে সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ, আদালতের মামলা, ব্যাংক লেনদেন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি জড়িত।
তাই প্রশ্ন একটাই—
৬০ লাখ টাকা কি সত্যিই তিনটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন হয়েছিল? হলে টাকা কে নিয়েছিল? ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা ছিল? দুই দফা মামলা ও আপসের পরও অভিযোগের আর্থিক সত্যতা কতটুকু যাচাই হয়েছে? নতুন অভিযোগগুলোর তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়েছে? আর সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগেরই বা তদন্ত হবে কবে?
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় এবং দুদকের কাছে এখন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা— নথি, ব্যাংক রেকর্ড, সিসিটিভি ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক এবং তদন্তের ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।
