অনলাইন অর্ডারের আড়ালে ‘প্রতারণা চক্র’: কাস্টমাইজড পণ্য নিয়ে বিপাকে ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক :- অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা ও ই-কমার্স খাত যখন দেশের অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে, তখন অর্ডার করে পণ্য গ্রহণ না করা, ডেলিভারি রাইডারের সামনে দাম কমিয়ে দেওয়ার চাপ সৃষ্টি এবং ব্যবসায়ীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চক্রটির সদস্যরা বিভিন্ন অনলাইন শপ ও ফেসবুক পেজে পণ্য অর্ডার করেন। অর্ডারের সময় ফোন নম্বর, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য দিয়ে অর্ডার নিশ্চিতও করা হয়। পরবর্তীতে পণ্য নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছালে শুরু হয় অন্য ধরনের চাপ সৃষ্টি।
বিশেষ করে কাস্টমাইজড ও ভঙ্গুর পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। যেমন—একটি কাস্টমাইজড পণ্যের মূল্য যদি ১ হাজার টাকা হয়, তাহলে পণ্যটি ডেলিভারি রাইডারের সামনে নিয়ে ক্রেতা দাবি করেন, তিনি মাত্র ৫০০ টাকা দেবেন। অন্যথায় পণ্যটি ফেরত নিয়ে যেতে বলা হয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কাস্টমাইজড পণ্য সাধারণত নির্দিষ্ট ক্রেতার জন্যই তৈরি করা হয়। ফলে পণ্যটি ফেরত এলে সেটি অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উভয়মুখী ডেলিভারি ব্যয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে লোকসান হলেও ব্যবসায়ীকে বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্যটি দিয়ে দিতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কখনো কখনো ডেলিভারি রাইডারকে পণ্য ফেরত নিয়ে যেতে বলা হলেও রিটার্নের খরচ বহন করতে অনীহা প্রকাশ করা হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফোন রিসিভ না করা, পণ্য গ্রহণ না করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে পার্সেল রিটার্ন করিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, পণ্য বা মূল্য নিয়ে সমঝোতা না হলে সংশ্লিষ্ট অনলাইন ব্যবসায়ী বা ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অনুযায়ী, পেজ নষ্ট করে দেওয়ার হুমকি, ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতি করার কথা বলে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এ ধরনের ঘটনায় শুধু একটি পণ্যের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে না; বরং প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত রিটার্নের সঙ্গে প্যাকেজিং, কুরিয়ার, ডেলিভারি ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে আবির আহমেদ জয়
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আবির আহমেদ জয় নামের এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। তার সঙ্গে একজন নারী সহযোগীও রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বিভিন্ন অনলাইন শপে অর্ডার করা এবং পরবর্তীতে পণ্য গ্রহণ বা মূল্য পরিশোধ নিয়ে চাপ সৃষ্টি করার ঘটনায় আবির আহমেদ জয়ের নাম উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট অর্ডারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এবং অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
কাস্টমাইজড পণ্যই কেন হয়ে উঠছে ‘দুর্বলতা’?
ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের মতে, কাস্টমাইজড পণ্যের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। একজন ক্রেতার ছবি, নাম, লেখা বা বিশেষ ডিজাইন ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করার পর সেটি সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পুনরায় বিক্রি করা সম্ভব হয় না।
ফলে কেউ যদি জেনেশুনে এমন একটি পণ্য অর্ডার করে পরে নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক দিতে চান কিংবা পণ্যটি গ্রহণ না করেন, তাহলে ব্যবসায়ী একদিকে পণ্যের মূল্য হারান, অন্যদিকে ডেলিভারি ও রিটার্ন খরচও বহন করেন।
ভঙ্গুর পণ্যের ক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রিটার্নের সময় পর্যাপ্ত সতর্কতা না থাকায় কাচ বা অন্যান্য ভঙ্গুর পণ্য অনেক সময় ভাঙা অবস্থায় ফিরে আসে। তখন পণ্যটি বিক্রির সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ীদের দাবি—চক্র শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক
অনলাইন উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে শুধু ব্যক্তি ব্যবসায়ী নয়, পুরো ই-কমার্স খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ নিয়মিত অর্ডার রিটার্ন ও প্রতারণামূলক আচরণের কারণে ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে এবং অনেক উদ্যোক্তা অনলাইন ব্যবসা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, একজন ক্রেতার অর্ডার করার স্বাধীনতা যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যবসায়ীরও পণ্য তৈরি, ডেলিভারি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে অর্ডার করে পণ্য গ্রহণ না করা, ব্যবসায়ীকে ভয় দেখানো বা চাপ প্রয়োগ করে পণ্যের মূল্য কমিয়ে নেওয়ার মতো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া এবং একই সঙ্গে অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর অর্ডার-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে এই প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
Array