সৌদি আরবে বন্দি পুত্র, টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে হুমকির মুখে বাবা: মিঠাপুকুরে চাঞ্চল্য
শহীদুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক :- সৌদি আরব পাঠানোর নামে সাড়ে ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে এক যুবককে সেখানে কারাবন্দি করার অভিযোগ উঠেছে পীরগঞ্জের একটি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, জমিজমা বিক্রি করে দেওয়া সেই টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে উল্টো মারধর ও মিথ্যা মামলার হুমকির শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগী বাবা। এই ঘটনায় রংপুরের মিঠাপুকুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মিঠাপুকুর উপজেলার ১৪নং দুর্গাপুর ইউনিয়নের হরিনারায়ণপুর গ্রামের মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে মোঃ আমরুল মিয়া (৫৫) তাঁর ছেলে স্বপন মিয়াকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পীরগঞ্জ উপজেলার ৩নং বড়দরগা ইউনিয়নের ঢোলাকা গ্রামের এক প্রতারক চক্রের শরণাপন্ন হন। চক্রের মূল হোতা মোঃ ফরহাদ মিয়া (৪২), মোঃ ফিরোজ মিয়া (৪৩), মোঃ বুলু মিয়া (৬৫) এবং মোছাঃ রেহেনা বেগম (৩৫) আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, স্বপন মিয়াকে সৌদি আরবে ভালো চাকুরিতে পাঠানো হবে। কোনো সমস্যা হলে বা চাকুরি না হলে সম্পূর্ণ টাকা একযোগে ফেরত দেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতিও দেয় তারা।
চক্রের কথায় বিশ্বাস করে আমরুল মিয়া স্থানীয় সাক্ষী মোঃ আশিকুর রহমান ও মোঃ আবুল কালামের উপস্থিতিতে ফরহাদ মিয়ার হাতে নগদ ৫,৫০,০০০/- (সাড়ে পাঁচ লাখ) টাকা তুলে দেন। টাকা নেওয়ার পর নানা টালবাহানা শেষে গত ২৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে স্বপন মিয়াকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।
সৌদিতে নেমেই জেলহাজতে স্বপন:ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরপরই দেশটির পুলিশ স্বপন মিয়াকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। আকামা (বৈধ কাজের অনুমতিপত্র) বা বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকায় বর্তমানে তিনি সেখানে চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে কারাবন্দি রয়েছেন।
টাকা চাইতে গিয়ে হুমকি:ছেলের কারাবরণের খবর পেয়ে আমরুল মিয়া অভিযুক্তদের কাছে তার সন্তানকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু চক্রটি দিনের পর দিন টালবাহানা করতে থাকে। সর্বশেষ গত ০৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সকাল আনুমানিক ৮:৫০ মিনিটে আমরুল মিয়া ১নং বিবাদী ফরহাদ মিয়ার বাড়ির উঠানে গিয়ে পাওনা টাকা দাবি করলে আসামিরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে গালিগালাজ করে টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করে এবং স্বপন মিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। একই সাথে এই বিষয়ে আর কোনো বাড়াবাড়ি করলে আমরুল মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের মারপিট, হাত-পা ভেঙে দেওয়া ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও মীমাংসার প্রস্তাব:এদিকে এ বিষয়ে অভিযুক্ত ফরহাদ মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। স্বপন মিয়ার জেলে থাকার সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, “থানায় একটি অভিযোগ হয়েছে। আমরা বিষয়টি আপস-মীমাংসা করতে চাই। যে ব্যক্তি বিদেশে আছে সে আমারও ভাইয়ের মতো। আমার আর এক ভাই তাকে বিদেশে নিয়ে গিয়েছে।” তবে স্বপন সৌদি আরবের ঠিক কোন জেলে বন্দি আছেন, সে বিষয়ে কোনো বৈধ কাগজপত্র বা প্রমাণ দেখাতে পারেননি ফরহাদ মিয়া। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি তিনি কেবল লোকমুখে শুনেছেন।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা:এই ঘটনাটি দেশের অভিবাসন খাতের এক অন্ধকার চিত্রকে আবার সামনে এনেছে। দেশের সাধারণ একজন নাগরিক, যিনি নিজের পরিবার এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে একজন ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে বিদেশ পাড়ি জমান, এক শ্রেণীর দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে আজ তার জীবন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সচেতন মহল মনে করছেন, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর যথাযথ তদারকি ও কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবেই এমন চরম সংকট তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশের জন্য কখনোই ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে স্থানীয়ভাবে সালিশ-বিচারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ভুক্তভোগী পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তারা তাদের সন্তানকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা সাড়ে ৫ লাখ টাকা উদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
