ঘুষ নিলেন বিকাশে ভৈরব থানার ওসি নাম্বারে
বিশেষ প্রতিনিধি :– কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জমি দখলকে কেন্দ্র করে বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি কথিত অর্থ লেনদেনের একটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ওসি মাহবুবুর রহমান ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ৩ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে ভৈরব পৌর শহরের কমলপুর এলাকায় জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে মনির কন্ট্রাক্টরের বাড়ি ও দোকানপাট দখলের উদ্দেশ্যে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রতিপক্ষ মুর্শেদ মিয়ার লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। হামলার খবর পেয়ে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ মিয়া ও হাবিবুর রহমানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় যোগাযোগ করা হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, খবর দেওয়ার পরও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় নেয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরও হামলা ও ভাঙচুর প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং পুলিশ সদস্যরা রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, ঘটনার সময় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাড়িঘর ও দোকানপাটে ক্ষয়ক্ষতি এবং লুটপাটের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পুলিশ যাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলায় বাধা না দেয়, সে উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষ মুর্শেদ মিয়ার পক্ষ থেকে ওসি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এরপর ওই দিন বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে মুর্শেদ মিয়ার ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বর থেকে ওসির ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠানো হয় বলে দাবি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথিত লেনদেনের স্ক্রিনশটে একটি ট্রানজেকশন পরিচিতি হিসেবে ‘ডিজে৩২সিপিবি৪০কিউ’ উল্লেখ রয়েছে। তবে এই স্ক্রিনশটের সত্যতা এবং লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তাঁরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে ওসি মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান বলে তাঁর দাবি। প্রায় এক সপ্তাহ থানায় ঘুরেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের আশায় কিশোরগঞ্জ আদালতে মামলা করতে বাধ্য হন তাঁরা। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পরপরই পুলিশের সহযোগিতা পাওয়া গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
এদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই নম্বরে আমার বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা থাকলেও কোনো লেনদেন করা হয়নি। গত ৩ অক্টোবর আমার নম্বরে কে বা কারা টাকা পাঠিয়েছে, তা আমি এখনো দেখিনি। আমার বিরুদ্ধে আনীত ঘুষের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’
অন্যদিকে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুছা শেখ। তিনি বলেন, বিকাশে টাকা লেনদেনের বিষয়টি তাঁরা শুনেছেন। নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিকাশের কল সেন্টার থেকে আনুষ্ঠানিক স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হবে। তদন্তে ওসির নম্বরে ঘুষের টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটে দেখানো লেনদেনের সত্যতা কী এবং এর সঙ্গে জমি দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বিকাশ লেনদেনের আনুষ্ঠানিক তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই বিষয়টির প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব।
Array