কালিহাতীর এইচএসসি-২০২৬ এর ফলাফলে হতাশার চিত্র এবং উচ্চ শিক্ষার মান হবে নিমজ্জিত। পাসের হার ৪০.৩০, জিপিএ-৫ মাত্র ৩
স্টাফ রিপোর্টার: – টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কলেজগুলোতে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার সার্বিক মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপজেলার ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ২ হাজার ৮০৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৩২ জন। সে হিসাবে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪০.৩০ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৩ জন।
এ ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার চিত্র নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের জবাবদিহি, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উপজেলার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে শিল্পপতি ফেরদৌস আলম ফিরোজ প্রতিষ্ঠি লায়ন ফেরদৌস আলম ফিরোজ কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ১১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯৭ জন। পাসের হার ৮৫.০৯ শতাংশ। এ প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ জন।
অন্যদিকে বল্লা করোনেশন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৭৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮৯ জন। পাসের হার ৫১.১৫ শতাংশ।কালিহাতী সংসদীয় আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব লুৎফর রহমান মতিন প্রতিষ্ঠিত লুৎফর রহমান মতিন মহিলা কলেজের ৩৬৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৬৫ জন। পাসের হার ৪৫.৩৩ শতাংশ। এ প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন।
কালিহাতীর আউলিয়াবাদে প্রবীণ রাজনোতিক আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী প্রতিষ্ঠিত আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের পাসের হার ৪৩.২৮ শতাংশ। ১৩৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫৮ জন।সাবেক এমপি হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী প্রতিষ্ঠিত শহীদ শাহেদ হাজারী কলেজের ৩৫৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৪৯ জন। পাসের হার ৪১.৯৭ শতাংশ।
এলেঙ্গায় প্রয়াত হাকিম তালুকদার প্রতিষ্ঠিত সরকারি শামসুল হক কলেজের ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩১৩ জন। পাসের হার ৪১.২৪ শতাংশ। নারান্দিয়া টিআরকেএন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৪ জন। পাসের হার ৩৭.৭৮ শতাংশ।
স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠক প্রয়াত শাজাহান সিরাজ প্রতিষ্ঠিত কালিহাতী শাহজাহান সিরাজ কলেজের ফলাফল আরও উদ্বেগজনক। প্রতিষ্ঠানটির ৬০৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৮৪ জন। পাসের হার ৩০.২৬ শতাংশ।কালিহাতী চরাঞ্চলের যমুনা কলেজের ১৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৪২ জন। পাসের হার ২১.৩২ শতাংশ।চারানের ডা. সৈয়দা খান মহিলা কলেজের ১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ১০ শতাংশ।
ফলাফল বিশ্লেষণে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে
সামগ্রিক ফলাফলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, উপজেলার সবচেয়ে বেশী পরীক্ষার্থীসংখ্যার প্রতিষ্ঠান সরকারি শামসুল হক কলেজ। ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩১৩ জন পাস করলেও পাসের হার ৪১.২৪ শতাংশ। এত বড় প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জিত না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরী ।
দ্বিতীয়ত, কালিহাতী শাহজাহান সিরাজ কলেজে ৬০৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৮৪ জনের উত্তীর্ণ হওয়া এবং যমুনা কলেজে ২১.৩২ শতাংশ পাসের হার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল পর্যালোচনায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, উপজেলার ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২টি প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ-৫ এসেছে। অর্থাৎ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকেই কোনো শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ জিপিএ অর্জন করতে পারেনি। এটি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান ও উচ্চতর শিক্ষাগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আরও মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজনীয়তার জানান দেয়।
দায় এড়ানোর সুযোগ নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর
শিক্ষার মানোন্নয়নের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের একার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। একটি ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি এবং শিক্ষা প্রশাসনের সম্মিলিত ভূমিকা অনস্বীকার্য।
নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদান, সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ—এসব বিষয় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারনা।
একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার তুলনামূলকভাবে ভালো, তাদের পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রয়োজন শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারি
কালিহাতী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির উচিত ফলাফলভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা সভা করে দূর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি অকৃতকার্য হয়েছে, শিক্ষকদের পাঠদানের ঘাটতি কোথায়, নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না এবং পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে কি ধরনের দুর্বলতা ছিল—এসব বিষয় চিহ্নিত করা অতি জরুরি।
বিশেষ করে ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ একাডেমিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। শুধু ফলাফল প্রকাশের পর আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, বরং পরবর্তী পরীক্ষার আগে থেকেই তদারকি ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
হতাশা নয়, ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ চাই
শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। কালিহাতীর মতো সম্ভাবনাময় একটি উপজেলার উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ফলাফল যদি এভাবে হতাশাজনক থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উচ্চশিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক কর্মজীবনে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এ ফলাফলকে কেবল ব্যর্থতার পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, কালিহাতীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বশীলতা, শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতার সমন্বয়ে কালিহাতীতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
কারণ, শুধু পাসের হার বাড়ানো নয়, মানসম্মত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
