৯ লাখ টাকার বিনিময়ে তিন রোহিঙ্গাকে জন্মসনদ দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত; একজন সাময়িক বরখাস্ত হলেও অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন
স্টাফ রিপোর্টার :- কুমিল্লা দেবিদ্বার উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অর্থের বিনিময়ে তিন রোহিঙ্গা নাগরিককে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগের তদন্তে অনিয়মের সত্যতা মিলেছে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সচিব নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক।
তবে একই ঘটনায় অভিযুক্ত প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য গাজী সালাহ উদ্দিন রুহুলের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ ও তদন্তে নাম আসার পরও তিনি কীভাবে ইউপি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে জনমনে আলোচনা চলছে।
গত ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে ফতেহাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা শফিউল আলম জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ, মুবিনা খাতুন ও হাফিছা—এই তিনজন রোহিঙ্গা নাগরিককে ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগটি আমলে নিয়ে গত ১৯ জুলাই রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে কুমিল্লা জেলা প্রশাসককে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে।
গত ৬ আগস্ট দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিনজনের নামে ইস্যু করা জন্ম নিবন্ধন সনদে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়া এবং তথ্যের অমিল থাকায় ওই জন্ম নিবন্ধন সনদগুলো বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধির ভূমিকার বিষয়টিও উঠে আসে।
এরই ধারাবাহিকতায় রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ৪৬.০৪.০০০০.১০৫.২৭.০০২ (অংশ-৪).২৪.৭৪ নম্বর স্মারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই নির্দেশনার পর কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ০৫.২০.১৯০০.০০০.০০৯.৩৬.০০০৮.২৬-৮৩০ নম্বর স্মারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়।
নোটিশে তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, নজরুল ইসলাম ও প্যানেল চেয়ারম্যান গাজী সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থের বিনিময়ে তিনজন রোহিঙ্গা নাগরিককে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে উপযুক্ত জবাব দিতে বলা হয়।
এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক।
এ ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও একই অভিযোগে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য গাজী সালাহ উদ্দিন রুহুলের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২৫ আগস্টের স্মারকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে সরকারি জন্ম নিবন্ধন ডাটাবেজ BDRIS-এর শুদ্ধতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তে প্রমাণিত অনিয়মের বিষয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ এবং প্রযোজ্য সাইবার আইন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার আইন ও কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য প্রদানকারী ইউপি সদস্যদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গৃহীত ব্যবস্থা ও তার ফলাফল দ্রুত রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়কে অবহিত করার জন্যও বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধি গাজী সালাহ উদ্দিন রুহুল এখনও কীভাবে ইউপি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একই ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে, তাদের একজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অপরজনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? তিনি যদি এখনও দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না?
এছাড়া সালাহউদ্দিন রুহুল দায়িত্ব পালন কালে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও ইউএনও বরাবর একটা অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা যায়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা ফ্যামিলি প্লানিং অফিসার তদন্ত করে ইউএনও বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন এবং অদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেন। এছাড়া লক্ষীপুরে ১০ লক্ষ টাকার একটি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং আরো ৪১ টি জন্ম নিবন্ধন সনদ জালিয়াতির অভিযোগ এডিসি (শিক্ষা) তদন্ত করছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে ফতেহাবাদ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন রুহুলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অশোক বিক্রম চাকমা বলেন ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে অতএব প্যানেল চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন রুহুল এর বিরুদ্ধে মিনিস্ট্রি থেকে ব্যবস্থা নিবেন।এবং আমাদের কাছে প্যানেল চেয়ারম্যান এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কোন চিঠি আসে নাই আসলে আমরা তা ব্যবস্থা নিব।
Array