১১বছরের ছাত্রীকে বিয়ে দিলেন মাদ্রাসার মুহতামিম, ৩ বছর পর একতরফা তালাক! মিঠাপুকুরে চাঞ্চল্য: বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে কাঁদছে নির্যাতিতা কিশোরী
নিজস্ব প্রতিবেদক :- :রংপুরের মিঠাপুকুরে এক মাদ্রাসার মুহতামিমের বিরুদ্ধে নিজ মাদ্রাসার ১১ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে ফুসলিয়ে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আপন বড় ভাইয়ের সাথে বাল্যবিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ তিন বছর সংসার করার পর বর্তমান কিশোরী ওই শিক্ষার্থীকে তার দাদার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে একতরফা তালাক দিয়েছেন মুহতামিমের ভাই। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কোমরগঞ্জ বাজারের ‘আয়শা সিদ্দিকা (রাঃ) মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসা’য়। একজন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল প্রধান হয়ে কীভাবে তিনি ১১ বছরের শিশুর বাল্যবিয়ে পড়ালেন, তা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
সরেজমিনে তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, মিঠাপুকুর উপজেলার ৫ নং বালারহাট ইউনিয়নের গোপিনপুর পশ্চিম গাড়ালচৌকি গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবারের কন্যা মোসাম্মৎ জিমু আক্তার। বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে করে চলে যাওয়ায় ছোটবেলা থেকেই জিমু বড় হয়েছে তার দাদার কাছে। দাদার স্বপ্ন ছিল নাতনিকে হাফেজা বানাবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই জিমুকে ৬ নং কাফ্রিখাল ইউনিয়নের কোমরগঞ্জ বাজার সংলগ্ন আয়শা সিদ্দিকা (রাঃ) মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। কিন্তু মাদ্রাসায় ভর্তির কিছুদিন যেতে না যেতেই অবুঝ শিশুটির ওপর কু-নজর পড়ে মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ কারী মোঃ আশিকুর রহমানের।
মাদ্রাসার ভেতরেই নির্যাতন ও জোরপূর্বক বিয়ে ভুক্তভোগী জিমু আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই প্রতিবেদককে জানায়, “আমরা গরিব হওয়ায় মাদ্রাসার হুজুর প্রায়ই আমাকে বলতেন, ‘তুমি তো টাকা-পয়সা দিতে পারো না, এদিকে এসো আমার হাত-পা টিপে দাও।’ সেবা নেওয়ার বাহানায় তিনি বিভিন্ন সময় আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাত দিতেন। লোকলজ্জা আর পড়ার ক্ষতি হওয়ার ভয়ে আমি সবকিছু সহ্য করে মাদ্রাসায় থাকতাম।”
জিমু আরও জানায়, একই বাড়িতে মাদ্রাসা ও হুজুরের বাসা হওয়ায় সেখানে অবাধ যাতায়াত ছিল মুহতামিমের বড় ভাই আশরাফুল ইসলামের। আশরাফুল পূর্বের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে হুজুরের বাসাতেই থাকতেন। চকোলেট-বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে আশরাফুলও জিমুকে কুপ্রস্তাব দিতে শুরু করেন। একদিন আশরাফুল জেমুকে ঘরের ভেতর ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক জাপটে ধরেন। জিমু চিৎকার করলে মুহতামিম আশিকুর রহমান সেখানে আসেন। কিন্তু ভাইয়ের অপকর্মের বিচার না করে উল্টো ঘটনা ধামাচাপা দিতে ১১ বছরের শিশু জিমুর সাথে তার তালাকপ্রাপ্ত বড় ভাইয়ের বিয়ে পড়িয়ে দেন মুহতামিম নিজেই।
৩ বছর পর একতরফা তালাক বিয়ের পর থেকেই জিমুর ওপর চলতো নানামুখী নির্যাতন। জিমু জানতো না যে আশরাফুলের পূর্বের স্ত্রী রয়েছে। দীর্ঘ তিন বছর এভাবে চড়াই-উতরাই পার করার পর, আশরাফুল তার পূর্বের তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে পুনরায় যোগাযোগ শুরু করেন। এরপর জিমুকে কৌশলে বালারহাটে তার দাদার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর মাত্র ১৫ দিন পর ডাকযোগের মাধ্যমে জিমুর কাছে একতরফা তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়।
অসহায় জিমু আক্তার আর্তনাদ করে বলে, “আমরা গরিব, আমাদের বিয়ের কোনো কাবিননামা বা কাগজ পাতিও তারা আমাকে দেয়নি। এখন তারা বলছে আমি নাকি কিছুই করতে পারব না। আমি ওই মুখোশধারী হুজুর আর তার লম্পট ভাইয়ের উপযুক্ত বিচার চাই।”
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও এলাকাবাসীর ক্ষোভবাল্যবিয়ে ও তালাকের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ মাওলানা কারী মোঃ আশিকুর রহমান বিয়ে ও তালাকের কথা স্বীকার করেন। তবে নিজের অপরাধ ঢাকতে উল্টো ভুক্তভোগী শিশুর চরিত্রের ওপর দোষ চাপিয়ে বলেন, “মেয়ের চরিত্র ভালো নয়।” কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে ১১ বছরের একটি শিশুর বিয়ে কেন তিনি নিজে পড়ালেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
একই বিষয়ে মুহতামিমের বড় ভাই আশরাফুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই মেয়ের “বিয়ের কাবিননামা নেই , (জিমু) কিছুই করতে পারবে না। মেয়ের চরিত্র ভালো না, তাই তালাক দিয়েছি।” তবে এক শিশু শিক্ষার্থীকে কেন তিনি বিয়ে করেছিলেন, সেই প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে তিনিও কৌশলে সটকে পড়েন।
একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে পবিত্র পোশাকধারী মুহতামিম ও তার ভাইয়ের এমন পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে ফুসে উঠেছে স্থানীয় এলাকাবাসী। একজন সুরক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের এমন আইনবহির্ভূত ও অনৈতিক কাজের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৬ নং কাফ্রিখাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন মাস্টার বলেন,হ্যাঁ তারা আমার কাছে এসেছে বিষয়টি স্পর্শকাতর ও বেদনাদায় আমি তো এর বিচার করতে পারিনা তাই ভুক্তভোগীকে বিজ্ঞ আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে তদন্ত সাপেক্ষে মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
