সীমানা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা: গ্লোবাল লিডারশিপ ও একাডেমিক সৌহার্দ্য প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
সীমানা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা: গ্লোবাল লিডারশিপ ও একাডেমিক সৌহার্দ্য —প্রফেসর ড. আসিফ মিজান ?
বিংশ শতকের শেষদিক থেকে আজকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বিশ্বায়ন উচ্চশিক্ষার চরিত্র পাল্টে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আর কেবল ক্লাসরুম-ভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এখন সীমাহীন জ্ঞানের একটি নেটওয়ার্ক, যেখানে ছাত্র-শিক্ষক এবং গবেষকরা ভূগোলকে পাশ কাটিয়ে যোগস앝 করে। উপাচার্য ও অধ্যাপক হিসেবে আমি বারবার দেখেছি- আন্তর্জাতিক একাডেমিক সম্পর্কই শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকা শক্তি।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কেন কার্যকর? কারণ তথ্যই অনুক্রমিক। আন্তর্জাতিক সহ-লেখকত্ব ও সীমান্ত পেরিয়ে হওয়া গবেষণার প্রবন্ধগুলো একক দেশভিত্তিক গবেষণার তুলনায় অধিক স্বীকৃতি পায়; সাইটেশন ও প্রভাবগত সূচকগুলো অনেক ক্ষেত্রে উচ্চতর থাকে (Scopus/Elsevier বিশ্লেষণ; Nature Index রিপোর্ট)। সহজ কথায়, যখন গবেষণায় বহুসংস্কৃতিগত দক্ষতা মিশে, ফলাফলগুলো বিশ্বমঞ্চে দ্রুত চোখে পড়ে।
ছাত্র-শিক্ষা যেখানে যায়, সুযোগও বাড়ে। ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান দেখায় বৈশ্বিকভাবে উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে এবং আন্তঃদেশীয়ভাবে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য কয়েক দশকে গুণান্বিত হয়েছে (UNESCO, সাম্প্রতিক ডেটা)। বাংলাদেশের তরুণ প্রতিভারা যদি এসব আন্তর্জাতিক দরজায় অংশ নিতে পারে, তাহলে শুধু ব্যক্তিগত উন্নতিই নয় – দেশে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।
কী কী সুফল হাতে আসে? সহজ কয়েকটা উদাহরণ মনে রাখুন:
– ক্রেডিট ট্রান্সফার: শিক্ষার্থী সহজে কোর্স বদলাতে ও বৈশ্বিক শিক্ষায় যুক্ত হতে পারে।
– যৌথ/দ্বৈত ডিগ্রি: একসাথে দুই সংস্কৃতির শিক্ষার মিশ্রণ।
– আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ ও তহবিল: মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের সুযোগ (OECD/World Bank নির্দেশনা অনুশীলনে দেখা যায়)।
বিশ্বমানের র্যাংকিং-গুলোও আন্তর্জাতিকতার ওপর গুরুত্ব দেয়। Times Higher Education ও QS-এর মতো র্যাংকিং মেট্রিক ‘International Outlook’ ধরে- আন্তর্জাতিক শিক্ষক, ছাত্র ও সহ-লেখকত্বের অনুপাতকে মূল্যায়ন করে। পাশাপাশি, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য—বিশেষত SDG-4 ও SDG-17- ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে অপরিহার্য করে তোলে।
তবে সমস্যা শুধু অংশগ্রহণ বাড়ানো নয়; অংশীদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই করে তুলতেই মূল চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য ভালো, কিন্তু প্রতিষ্ঠানিক নীতি ও কাঠামো ছাড়া তা ছায়ার মতোই অস্থায়ী। তাই আমাদের দরকার:
– কৌশলগত আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নীতিমালা, যে প্ল্যান স্পষ্ট লক্ষ্য, দায়িত্ব ও মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।
– স্বীকৃত ক্রেডিট ও ডিগ্রি ট্রান্সফার প্রসেস, যাতে শিক্ষার্থীরা সুবিধা পায়।
– বহুভাষিক সাপোর্ট ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি, যাতে বিদেশী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সহজে সংযুক্ত হতে পারে।
– যৌথ তহবিল ও গবেষণা পরিচালনার স্বচ্ছ কাঠামো, যাতে সহযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জগুলো- জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তি এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তর- দেশ-সীমা অতিক্রম করে আসে। এসব জটিল সমস্যার মোকাবিলায় একেকটা দেশের একে অপরের সাথে নির্মিত শক্তিশালী একাডেমিক নেটওয়ার্কই কার্যকর প্রতিষেধক। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গবেষণার অবকাঠামো, নীতি-সমন্বয় এবং জ্ঞানের দ্রুত আদান-প্রদান নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলব: আমাদের উচ্চশিক্ষা গত কয়েক বছরে বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও গবেষণার মানে আরও উন্নতির সুযোগ আছে। কৌশলগতভাবে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুললে আমরা ‘ব্রেন ড্রেন’ থেকে ‘ব্রেন গেইন’-এ সরে আসতে পারি—বিদেশি নেটওয়ার্ক আমাদের তরুণদের অভিজ্ঞতা, সম্পদ ও সুযোগে যোগ করবে। প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো শুধু বন্ধুত্ব গড়া নয়, সেই বন্ধুত্বকে চিরস্থায়ী নীতি, কাঠামো ও সহযোগী ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।
আন্তর্জাতিক একাডেমিক সৌহার্দ্য কেবল মনোরম সম্পর্ক নয়; এটি একটি কৌশল, একটি বিনিয়োগ। যদি আমরা সংকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিককরণকে প্রাতিষ্ঠানিক করি, তাহলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা মানচিত্রে স্মরণীয় ভূমিকা রেখে যাবে। এই সীমানা-পেরিয়ে বন্ধনই আগামী দিনের নেতৃত্ব ও জ্ঞানের বিস্তারে আমাদের প্রধান চালিকা শক্তি হবে- এটাই আমার প্রত্যাশা।
Array