শিক্ষার মুখোশ ও বিবেকের মৃত্যু: একবিংশ শতাব্দীর সামাজিক ব্যাধি
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক : মায়ের পচা-গলা লাশ ঘরে পড়ে আছে এক সপ্তাহ ধরে, আর বাইরে তখন স্বাভাবিক ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাঁর পিএইচডিধারী, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর নামী স্কুলের শিক্ষিকা সন্তানরা। এই দৃশ্য কোনো রূপক গল্প বা সাহিত্যের পরাবাস্তব ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের তথাকথিত ‘আলোকিত’ ও ‘সভ্য’ সমাজের একবিংশ শতাব্দীর এক কুৎসিত ও নির্মম বাস্তব। যে মা নিজের জীবনের সবটুকু নিংড়ে দিয়ে, সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের বুয়েট, কানাডা কিংবা পিএইচডির সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দিলেন, জীবনের শেষ দিনগুলোতে সেই মায়ের কপালে জুটল এক চরম অবহেলা, নিঃসঙ্গতা আর মর্মান্তিক মৃত্যু।
এই পৈশাচিক ঘটনা আমাদের সামষ্টিক বিবেকের ভিত নাড়িয়ে দেয় এবং বুক চিরে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা আসলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর পরিবারে সন্তানদের কী বানাচ্ছি? একবিংশ শতাব্দীর মানুষ, নাকি স্রেফ অর্থ ও ক্ষমতার এক-একটি সংবেদনহীন রোবট?
পুঁথিগত শিক্ষার দেউলিয়াত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাঃ
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা জিপিএ-৫, উচ্চ ডিগ্রি আর লোভনীয় ক্যারিয়ারের এক অন্ধ ইঁদুরদৌড় তৈরি করেছে। এই প্রতিযোগিতার ভিড়ে পাঠ্যক্রম ও সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে ‘নৈতিকতা’, ‘সহমর্মিতা’ আর ‘মূল্যবোধ’-এর মতো সবচেয়ে জরুরি জীবনমুখী শিক্ষা। আমরা সন্তানদের মুখস্থ বিদ্যা গিলিয়ে মেধার সার্টিফিকেট দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাদের মানবিক সত্ত্বাকে হত্যা করছি।
যে শিক্ষা একজন উচ্চশিক্ষিত সন্তানকে মায়ের জীর্ণ ফ্ল্যাটের খবর রাখতে শেখায় না, অসুস্থ জন্মদাত্রীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করে না, সেই শিক্ষা আসলে আলো নয়, এক গভীর অন্ধকার। এটি শিক্ষার নামে এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব।
ভোগবাদী সমাজ ও সম্পর্কের বাণিজ্যিকীকরণঃ
আজকের বিশ্বায়িত সমাজ দাঁড়িয়ে আছে ‘ব্যক্তিস্বার্থ’ আর ‘চরম ভোগবাদ’-এর ওপর। যৌথ পরিবারের সনাতন ও সুরক্ষামূলক কাঠামো ভেঙে আমরা এখন আত্মকেন্দ্রিক ‘আমি এবং আমার চার দেয়াল’ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় রক্ত ও আবেগের সম্পর্কগুলোও এখন লাভ-ক্ষতির করপোরেট দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয়।
মা-বাবা যখন বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন এই স্বার্থপর সন্তানদের কাছে তাঁরা এক প্রকার ‘অনুৎপাদনশীল বোঝা’ হিসেবে গণ্য হন। উৎসব-পার্বণে, এমনকি পবিত্র কোরবানি বা ঈদের দিনেও যে সন্তানদের মনে মায়ের জন্য একটু সময় বা ভালোবাসার টান জাগে না, তারা কাঠামোগতভাবে মানুষ হলেও আত্মিকভাবে পশুর চেয়েও অধম।
উচ্চবিত্তের নৈতিক পচন ও অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিক রূপঃ
সমাজে একটি প্রচলিত সরলীকরণ আছে যে, কেবল অশিক্ষা বা দারিদ্র্যই অপরাধ ও নৈতিক স্খলনের জন্ম দেয়। কিন্তু বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। আজ সমাজের সবচেয়ে বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি, ব্যাংক লুটপাট, পাচার আর দুর্নীতির পেছনে রয়েছে এই টাই-কোট পরা উচ্চশিক্ষিত ও সুবিধাভোগী শ্রেণি। তারা আইন জানে, তাই আইন ফাঁকি দিতেও ওস্তাদ।
মায়ের প্রতি এই চরম নিষ্ঠুরতা আসলে সেই বৃহত্তর সামাজিক ও মানসিক পচনেরই একটি অংশ। যে ব্যক্তি নিজের জন্মদাত্রীকে অবহেলা করতে পারে, সে রাষ্ট্রের আমানত রক্ষা করবে কিংবা দেশের সম্পদ লুট করতে দ্বিধা করবে না—তা ভাবা চরম বোকামি।
যখন শিক্ষকের আসনে ‘অমানুষঃ
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাকায়ক ও আশঙ্কাজনক দিক হলো, সন্তানদের একজন আবার পেশায় শিক্ষিকা। যিনি নিজে মায়ের খোঁজ নেন না, ঘর পরিষ্কারের ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব পালন করেন না, তিনি শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিশুদের কী নৈতিকতা শেখাবেন? শিক্ষকেরাই যদি মানসিকভাবে এভাবে স্খলিত ও পচে যান, তবে আগামীর প্রজন্ম যে আরও ভয়াবহ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
উত্তরণের উপায়: দ্বি-মুখী কৌশল (আইন ও মনস্তত্ত্বের সমন্বয়)
এই সামাজিক ব্যাধি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর সমাধান কেবল একতরফা নয়, বরং দ্বি-মুখী:
ক) রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা ও আইনি ব্যবস্থার কঠোরতা
আইন হলো সমাজের জন্য একটি ঢাল, যা নৈতিকতাহীন মানুষকে অপরাধ করা থেকে বিরত রাখে।
ভরণপোষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ:
বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ রয়েছে, যেখানে সন্তানদের জন্য মা-বাবার দেখাশোনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাব ও আইনি জটিলতায় এর প্রয়োগ খুবই সীমিত। এই আইনের ধারাগুলো আরও কঠোর, গতিশীল ও স্বতঃস্ফূর্ত করা দরকার।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তি:
মা-বাবাকে অবহেলাকারী সন্তানদের চাকরি, পদোন্নতি, রাষ্ট্রীয় সুবিধা বা সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান থাকা উচিত। যখন একজন উচ্চপদস্থ আমলা বা অধ্যাপক জানবেন যে মায়ের অবহেলার কারণে তাঁর ক্যারিয়ার ও সামাজিক অবস্থান ধ্বংস হতে পারে, তখন ভয়ের কারণে হলেও তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হবেন।
খ) ভেতরের পরিবর্তন ও পারিবারিক সংস্কারঃ
আইন দিয়ে হয়তো কাউকে শারীরিকভাবে মা-বাবার পাশে দাঁড় করানো যাবে, কিন্তু মনের ভেতর ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা জোর করে তৈরি করা যাবে না। সেটার জন্য দরকার পারিবারিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংস্কার।
সহানুভূতির শিক্ষা:
শৈশব থেকেই সন্তানকে শেখাতে হবে যে মা-বাবা কোনো ‘আর্থিক বিনিয়োগ’ নন যে বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের থেকে লভ্যাংশ খুঁজতে হবে। মা-বাবা হলেন পরিবারের সবচেয়ে সম্মানিত ও আবেগের অংশ।
অভিভাবকত্বের (Parenting) পরিবর্তন:
অভিভাবকদেরও সন্তানের লালন-পালনের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। সন্তানদের শুধু ‘টাকা বানানোর যন্ত্র’ বা ‘জিপিএ-৫ পাওয়ার মাধ্যম’ হিসেবে বড় না করে, তাদের সাথে মানবিক ও আবেগীয় বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। সন্তান যেন সফল হওয়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল ও সহনশীল হতে শেখে।
মায়ের পচা-গলা লাশের গন্ধ আসলে শুধু সেই চার দেয়ালের ফ্ল্যাটেই সীমাবদ্ধ নয়; এই গন্ধ আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থার, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পচনের গন্ধ। আইন যদি বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করে অপরাধ কমায়, তবে পারিবারিক মূল্যবোধ ভেতর থেকে মানুষকে আলোড়িত করে প্রকৃত মানুষ বানায়। যতক্ষণ না এই দুইয়ের সঠিক সমন্বয় ঘটছে, ততক্ষণ শিক্ষার কাগজের সার্টিফিকেটের আড়ালে এমন ‘উচ্চশিক্ষিত অমানুষ’ তৈরি হওয়া বন্ধ হবে না।
সময় এসেছে চোখ খোলার। সন্তানদের শুধু পিএইচডি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আমলা বানানোর অন্ধ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র ও পরিবারকে নিতেই হবে। নয়তো আজ যে অবহেলা এই মা পেলেন, কাল তা আমাদের প্রত্যেকের দরজায় কড়া নাড়বে।
লেখক:উপাচার্য, দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক।
